• ২০২২ মে ২২, রবিবার, ১৪২৯ জ্যৈষ্ঠ ৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ৯:৩৯ পূর্বাহ্ন
  • বেটা ভার্সন
Logo
  • ২০২২ মে ২২, রবিবার, ১৪২৯ জ্যৈষ্ঠ ৮

অবকাশে ভোগান্তির ভাগাড় রমেক হাসপাতাল, বেপরোয়া কর্তৃপক্ষ

  • প্রকাশিত ৯:১৪ পূর্বাহ্ন শনিবার, মে ০৭, ২০২২
অবকাশে ভোগান্তির ভাগাড় রমেক হাসপাতাল, বেপরোয়া কর্তৃপক্ষ
ছবি-বেনিউজ২৪
জি.এম জয়, রংপুর ব্যুরো

নানা সমস্যায় জর্জরিত রমেক হাসপাতাল, ঈদ কিংবা পুজা যেকোনো ছুটি-অবকাশে চরম ভোগান্তির ভাগাড়ে পরিনত হয়। এসময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হতে হয় নিরুপায় রোগীদের। সবশেষ চিকিৎসাহীন মৃত্যুর শোক মাতমেই নানা প্রক্রিয়ার বেড়াজাল কাটিয়ে আপনজনের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় স্বজনদের!

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রমেক হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় দুই দিনে ১৩ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন ঘটনায় মৃত রোগীর স্বজনরা হাসপাতালের পরিচালক বরাবর লিখিতভাবে অভিযোগও করেছেন। কিন্তু বেপরোয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো আমলে নেননি।

রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, ঈদের প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে চিকিৎসকদের কেউই ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেননি। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দুই-একজন ছাড়া গেল দুই দিন কেউ হাসপাতালে আসেননি। জরুরি বিভাগে ভর্তির ব্যবস্থাপত্র নিয়ে রোগীরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে গেলেও কোনো চিকিৎসক রোগীদের দেখতে আসেননি। এমনকি ওষুধ সেবনের ব্যবস্থাপত্রও করে দেননি। শুধু তাই নয়, রোগীদের স্যালাইন ও কিছু ওষুধ লিখে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দায়সাড়া দায়িত্ব পালন করেছেন নার্স ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। ঈদকে ঘিরে চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্বে এমন অবহেলার কারণে বিনা চিকিৎসায় দুই দিনে ১৩ রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

সরেজমিনে জানা যায়, রমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ড, কিডনি ওয়ার্ড, গাইনি ও শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীদের নিয়ে চিন্তিত তাদের স্বজনরা। ওয়ার্ডগুলোতে ঠিকভাবে চিকিৎসাসেবা মিলছে না। নেই দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরাও। এতে জরুরি প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারছেন না কেউ। বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায় কাঁদছেন তাদের স্বজনরা।

ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মধ্যে হাতেগোনা দুই-একজন ছাড়া আর কেউ গত দুই দিন হাসপাতালে আসেননি। তাদের চেম্বারও বন্ধ ছিল। বেশির ভাগ ওয়ার্ডে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা এলেও অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রার পদমর্যাদার কোনো চিকিৎসক আসেননি। ঈদের তৃতীয় দিন সকালে কয়েকজন চিকিৎসককে দেখা গেলেও তারা কেউই বেশিক্ষণ হাসপাতালে অবস্থান করেননি।

ঈদের দিন মঙ্গলবার (০৩ মে) রাতে রংপুর নগরীর চব্বিশ হাজারী কদমতলা এলাকায় জুয়েল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সঙ্গে হাসপাতালে এসেছিলেন তার ছোট ভাই শিমুল। অনেক ছুটোছুটি করেও চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। বিনা চিকিৎসায় পরদিন সকালে মারা যান জুয়েল। তিনি রংপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সার্ভেয়ার ছিলেন।

মৃতের ছোট ভাই শিমুল জানায়, ঈদের দিন রাতে তার বড় ভাই জুয়েল অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাতে কোনো চিকিৎসক তার ভাইকে দেখতে আসেনি। এমনকি কোনো চিকিৎসাপত্রও দেওয়া হয়নি। শুধু চিকিৎসকের পরামর্শের অভাব আর বিনা চিকিৎসায় বুধবার সকালে তার বড় ভাই জুয়েলের মৃত্যু হয়। 

বিনাচিকিৎসা আর চিকিৎসকদের কর্তব্যে অবহেলায় বড় ভাইয়ের মৃত্যুর বিচার দাবি করে শিমুল হাসপাতালের পরিচালকের কাছে ইতোমধ্যে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

একই অভিযোগ পীরগাছা উপজেলার পূর্ব দেবু গ্রামের মৃত আব্দুল মালেক'র স্বজনদের। ঈদের দ্বিতীয় দিন বুধবার (০৪ মে) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মারা যায় আব্দুল মালেক। 

মৃত আব্দুল মালেকের মা ও সন্তানদের অভিযোগ, ঈদের দিন রাতে অসুস্থ আব্দুল মালেককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হলেও কোনো চিকিৎসক রোগীকে দেখতে আসেননি। হাসপাতালে সেবা নিতে এসে বিনা চিকিৎসায় আব্দুল মালেক মারা গেছেন।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে পেটের ব্যথা নিয়ে ভর্তি থাকা নীলফামারীর জুয়েলের অভিযোগ, ঈদের দিন থেকে কোনো চিকিৎসক তাকে দেখতে আসেনি। নার্স ও আয়া এসেছে দুই বার। হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধও দেওয়া হয়নি। উপায় না পেয়ে পরে ছাগল বিক্রি করে তিন হাজার টাকায় বাহির থেকে ওষুধ কিনে এনেছেন তিনি।

এমন অনেক অভিযোগ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগ রোগী ও তাদের স্বজনদের। নিরুপায় হয়ে গরীব অসহায় রোগীরা সরকারি এই হাসপাতালটিতে আসেন একটু চিকিৎসাসেবা পেতে। কিন্তু এখানে এসে হিতে বিপরীত!

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালে কর্তব্যরত একাধিক সূত্র জানায়, মেডিসিন বিভাগের মহিলা ওয়ার্ডে কোনো চিকিৎসা নেই। সিলিং ফ্যান ঘোরে না। ভ্যাপসা গরমে হাঁপিয়ে উঠেছে সবাই। কিডনি বিভাগের ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা কম হলেও সেখানেও চিকিৎসক নেই। টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ড বয় ও নার্সরাই এখন রোগীদের ভরসা। একই অবস্থা নেফ্রোলজি ওয়ার্ডেও। সেখানেও তালা ঝুলছে। সেখানকার রোগীদের ঈদের আগের দিন ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

প্যাথলজি বিভাগও বন্ধ। ঈদের আগে থেকে সব প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে কোনো রোগী ভর্তি নেই। যারা ছিলো ঈদের আগে তাদের সবাইকে বিদায় দেওয়া হয়েছে। গাইনি ও শিশু ওয়ার্ডে গিয়েও চিকিৎসকের দেখা না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে, হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও রংপুর মেডিকেল কলেজ (রিমেক) উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মাহফুজার রহমান গত দুই দিন তার ওয়ার্ডে আসেই নি বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। তার চেম্বারেও তালা ঝুলতে দেখা গেছে । বিষয়টি  জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।  

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে হাসপাতালের সহকারী ওয়ার্ড মাস্টার আব্দুস সালাম বলেন, দুই দিনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে সত্য, কিন্তু কেউই বিনা চিকিৎসায় মারা যায়নি। এসব রোগীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কম বেশি চার-পাঁচজন রোগীর মৃত্যু এমনিতেই হয়। 

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে ভিন্ন কথা! তাদের দাবি রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ সঠিক নয়! হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় কোন ত্রুটি নেই ! 

এ প্রসঙ্গে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের পরিচালক ডা. রেজাউল করিম বলেন, ঈদের সময়ে এ রকম একটু সমস্যা হয়। তবে রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে কোনো বিঘ্ন ঘটছে না। আমাদের চিকিৎসক, নার্স, ইন্টার্ণরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন। 

রোগী মৃত্যুর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিনা চিকিৎসায় কেউ মারা যাননি। দুই দিনে ১৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টিও সঠিক নয়। এমনিতেই হাসপাতালে প্রতিদিন বেশ কয়েকজন রোগী মারা যান। এসব স্বাভাবিক মৃত্যু। 

উত্তরাঞ্চলে সর্বসাধারণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ব্রতী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটিতে ভোগান্তি এখন চরমে । চিকিৎসক-নার্সের অবহেলা আর কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নিষ্পেষণে নাভিশ্বাস রোগী ও তাদের স্বজনরা। সবশেষ নিরুপায় রোগীরা বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেও টনক নড়েনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের! 


সর্বশেষ